যার শরীরের রস শোষণ করে
দশ মাসের গর্ভবসতি ছেড়ে সবুজ পৃথিবীর আলো-ছায়া গায়ে মেখে বেড়ে উঠি, তিনি আমাদের "মা"। সেই ছোটবেলা থেকে অবুঝ আঙুল ধরে মা-ই আমাদের গড়ে তোলেন
তার মনের মতো করে, যেন তার সন্তান জীবনের পথ চলায় কখনও থেমে না যায়। মায়ের
মুখের ভাষা নিয়েই আমাদের প্রতিদিনের কথা বলা। জীবনের সন্ধান দিয়ে মা যেমন আমাদের
ঋণী করেছেন, তেমনি তার নারী জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষার অধ্যায় মাতৃত্ব
উপভোগ করেন। তাই সন্তান এবং মায়ের এ বন্ধন জাগতিক সব বন্ধনের ঊধর্ে্ব। সবশেষে মা
এমন এক আশ্রয় যার স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসার ছায়ায় সব ভয় কেটে যায়। মায়ের গায়ের চির
পরিচিত ঘ্রাণ কল্পনা করে মায়ের কথা ভাবতে কার না ভালো লাগে। মায়ের কাছেই যত আবদার, মায়ের কাছেই যত প্রশ্রয়।
ছোটবেলায় হাত ধরে মা
হাঁটতে শেখান, কথা বলতে শেখান,
পরিচয় করিয়ে দেন বর্ণমালার সঙ্গে, জীবন ছেঁকে নেওয়া অভিজ্ঞতা থেকে ভালো-মন্দের
ভেদাভেদ শেখান। অপরিচিত সবকিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এককথায় আমাদের সব
নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু আমাদের মা। বলতে গেলে এমন অজস্র কথা ঋণের মতো আমাদের
সামনে চলে আসে। মায়ের এ ঋণ শোধ করবে,
সেই সাধ্য আছে কার!
একটা নির্দিষ্ট বয়স পার
হলে আমরা যখন আমাদের দায়িত্ব নিতে শিখে যাই,
তখন একটু একটু করে মায়ের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে।
মায়ের সঙ্গে সম্পর্কে চলে আসে কেমন এক আড়াল-আড়ষ্ট ভাব, যা শুধু বাড়তেই থাকে। তবুও মা তার খালি কোল
নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন সন্তান তার ফিরে আসবে,
সন্তানকে ছোটবেলার মতো আদর করে বুকে জড়িয়ে নিতে। মায়ের
প্রতি আমরা আমাদের আচরণ নিয়ে কতটা যত্নশীল,
সেটা একটি প্রশ্ন হতে পারে। নিজেকে নিজে আমরা এ প্রশ্ন
কতদিন করেছি; কিংবা এ নিয়ে আদৌ ভাবি কি-না তারও কোনো সদুত্তর আমরা দিতে
পারব না।
আজ বিশ্ব মা দিবস। যদিও
মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের কোনো নির্দিষ্ট দিন নেই, তবুও একটি দিন মায়েদের জন্য নির্দিষ্ট করে
রাখার চিন্তায় প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিক মা দিবস হিসেবে
উদযাপন করা হয়। ইতিহাস বলে ‘মা দিবসের’ প্রচলন শুরু হয় সর্বপ্রথম প্রাচীন গ্রিসে। বসন্তকালে একটি
দিন দেবতাদের মা ‘রিয়া’ যিনি ক্রোনাসের সহধর্মিণী তার উদ্দেশে উদযাপন করা হতো।
রোমানরা মা দিবস পালন করত ১৫ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে। তারা দিনটিকে উৎসর্গ করেছিল ‘জুনো’র প্রতি। ষোড়শ শতাব্দীতে ইস্টার সানডের ঠিক তিন সপ্তাহ আগের
রোববারে ‘মাদারিং সানডে’ নামে এ দিনটি যুক্তরাজ্যেও উদযাপন করা হতো।
জুলিয়া ওয়ার্ড হোই রচিত ‘মাদার্স ডে প্রক্লেমেশন’
বা ‘মা দিবস’-এর ঘোষণাপত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের
প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ও সমসাময়িক অন্যান্য যুদ্ধের
নৃশংসতার বিরুদ্ধে ১৮৭০ সালে রচিত হোইয়ের মা দিবসের ঘোষণাপত্রটি ছিল একটি
শান্তিকামী প্রক্রিয়া। ১৮৫৮ সালে শান্তিকর্মী অ্যান জার্ভিসের প্রচেষ্টাকেই মূলত
সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন জুলিয়া ওয়ার্ড। অ্যান জার্ভিসের মৃত্যুর পর তার
মেয়ে মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে কাজ শুরু করলেন ‘মা দিবস’ উদযাপনে। ১৯০৮ সালের ১০ মে তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার
গ্রাফিটন শহরের একটি চার্চে যেখানে তার মা অ্যান জার্ভিস রোববারে পড়াতেন, সেখানে প্রথমবারের মতো দিনটি উদযাপন করলেন।
পরে ধীরে ধীরে এ দিবসটি প্রসার লাভ করতে থাকে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দিনটি পালন
করা হয়।
একজন মা তার সন্তানের
সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে থাকেন সব সময়। মায়ের কোলে শুয়ে থেকে গল্প শুনে বেড়ে ওঠার
দিনগুলোর কথা কেউ ভুলতে পারে না কখনও। মা-ই আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে আপন শিক্ষক।
মা দিবসে তাই আমরা আমাদের মায়েদের দিতে পারি অন্য দিনের চাইতে একটু বেশি ভালোবাসা।
যদিও প্রতিটি দিনই হওয়া উচিত মায়েদের জন্য। তবুও মা দিবসে মায়ের জন্য একটি উপহার
হতে পারে মায়ের সেরা পাওনা। মাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতে পারেন এ দিবসে। নিজ হাতে মাকে
রান্না করে খাওয়ালে মায়ের আনন্দে কোনো কমতি থাকবে না। মায়ের পছন্দের জিনিস উপহার হিসেবে
দিতে পারেন। শাড়ি, গহনা, বই, ডায়েরি, মগ, গানের সিডি,
ব্যাগ, ফ্রেমে বাঁধানো ছবিও থাকতে পারে আপনার উপহারের তালিকায়।
মা দিবসকে সামনে রেখে
বেশ কিছু ফ্যাশন হাউসে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। মগের মধ্যে ‘মা’
লিখে, মাকে নিয়ে লেখা কবিতা ও অলঙ্কার পাওয়া যাচ্ছে রাজধানীসহ
দেশের বেশ কিছু ফ্যাশন হাউসে। মাকে নিয়ে নির্বাচিত গানের সিডিও পাওয়া যাচ্ছে। দেশি
দশ, আড়ং, আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেটে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে মায়েদের জন্য
এসব উপহার। ফ্যাশন হাউসগুলোয় ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকার ভেতর শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ;
৯০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে মগ,
বিভিন্ন দামের গহনা এবং ৫০ টাকা থেকে শুরু ১৫০০ টাকায়
বিভিন্ন শোপিস পাওয়া যাচ্ছে। বসুন্ধরা সিটি,
আজিজ সুপার মার্কেট,
নিউমার্কেট,
গাউসিয়া কিংবা হকার্স মার্কেটে পাওয়া যাবে এসব উপহার। নিজের
সাধ্য অনুযায়ী উপহার কিনে মাকে দিতে এ দিনে কেউ যেন ভুলে না যাই।
হুমায়ুন আজাদ তার ‘আমাদের মা’
শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন_
‘আমাদের মা আর দুধভাত নয়,
আমরা আর দুধভাত পছন্দ করি না
আমাদের মা আর ছোট্ট
পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে
আমরা কবে ভুলে গেছি কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত
আমাদের মা আজো টলমল
করে।’
মায়ের টলমল চোখের মুখ
যেন আমাদের আর দেখতে না হয়। মা যেন শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া এবং লালন-পালনের
নির্ধারিত মানুষ হয়ে অবহেলিত হয়ে না থাকেন। মায়ের প্রতি মনের গহিনে আলাদা করে একটু
ভালোবাসা যেন তোলা থাকে সবার। মা-ই যেন হন আমাদের সব সফলতা আর আগ্রহের
কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এই পৃথিবীতে মায়ের তুলনা তো মায়ের সঙ্গেই।
তথ্যসূত্র: সমকাল/শৈলী